| রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্য |
| রূপরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের সূচি |
| কেহ না পাইল অন্ত তপস্যা করিয়া | অতেব নারদ বুলে মহিমা গাইয়া || যে বর মাগিবে সতী সেই বর দিব | মনের বাসনা তোর সফল করিব || এত শুনি বলে সতী অভয় চরণে | তুমি ধর্মঠাকুর আমি জানিব কেমনে || বলিতে উচিত পাছে মনে কর ক্রোধ | যদি দেখ চতুর্ভুজ মনের প্রবোধ || যেরূপ হইয়াছিলে দ্রৌপদীর কাছে | সেইরূপ দেখিতে আমার সাধ করে || নতুবা যেরূপ হৈলে পারিজাতহরণে | সেইরূপ দেখিব ঠাকুর নিরঞ্জনে || হাসিয়া বলিব সতী বিনয় বচন | অতস্মাত চতুর্ভুজ গরুড়বাহন || আজানুলম্বিত মাল্য দূর্বাদলশ্যাম | চরণে পড়িয়া কান্দে কোটি মণিরাম || বিমুখ আছিল রাণী সমুখ হইল | চতুর্ভুজ রূপ দেখি কান্দিতে লাগিল || কলিঙ্গা করেন স্তব ব্রহ্মার মোহন | বিষম তোমার মায়া জানে কোন জন || বালক বাছুর চুরি হৈল বৃন্দাবনে | একা রূপ অনন্ত আপনি নারায়ণে || আপনি বালক হৈলে আপনি বাছুর | শিঙ্গা বেণু বেত নড়ি চরণে নূপুর || বিধি অগোচর মায়া আমি কোন ছার | দয়া কর ঠাকুর দিনের করতার || স্তব শুনি সুন্দর বলেন নিরঞ্জন | ঘরে চল এখনি রাউতি চারিজন || এত বলি ধর্মরায় হৈল অন্তর্ধান | রাণী সব পরম কৌতুকে ঘর যান || আনন্দের সীমা নাঞি ময়না নগরে | লাউসেন লয়্যা কিছু শুনিব উত্তরে || মোকাম কব়্যাছে বীর অজয়ার উপর | জোড়হাথে বলে কালু তার বরাবর || দিবসে দিবসে বাড়ে অজয়ার জল | পাথর পেলিলে ছয়মাসে যায় তল || বিলম্ব নাহিক সয় বত্সর সমুখ | ঢেকুর মহিমে রাজা কত পাব দুঃখ || এত শুনি লাউসেন ঘোড়ার মুখ চায় | বিপত্ত পড়িল বড় না দেখি উপায় || পার কব়্যা দিবে নদী অজয়ার জল | তবে যদি না পারিবে সত্য কথা বল || হানা দিবে ঢেকুরে দক্ষিণ গড় নিব | ইছাই সহিত শীঘ্র রণে হানা দিব || দক্ষিণ দরিয়া গুরু কুড়ি বাঁশ জল | আমাকে লইয়া পাছে যাহ রসাতল || এত শুনি হয়বর করে অহঙ্কার | দশবার দিবসে হইব পারাপার || কোন ছার অজয় নদী কোনখানে গণি | সমুদ্র লঙ্ঘিতে পারি শুন নৃপমণি || ঘোড়ার বচন শুনি আনন্দ হৃদয় | ভেলা বান্ধ্যা পার হব ডোমের তনয় || চারি মাস চাহিনু নৌকার তত্ব নাই | কত আর বিলম্ব করিব এই ঠাঁই || অবিলম্বে ভেলা বান্ধ পার হবে যদি | ঢেকুর ভুবন পাল্যে যেবা করে বিধি || বীর কালু শুনি এত সরস বচন | ভেলা বান্ধে ডোম যত পরম যতন || গুয়া নারিকেল গাছ কাটে রামকলা | পরম যতনে বান্ধে পরিসর ভেলা || বেতের বন্ধনে ভেলা বান্ধিল সত্বর | দ্রব্যজাত রাখে যত তাহার উপর || দব়্যায় ভাসিল কালু যত ডোমগণ | ভেলা বাহি আপনি চলিলা নিরঞ্জন || ধর্ম সঙরণ করে কালুসিংহ বীর | পতঙ্গ বদনে জল উঠে এক তীর || পাইল দক্ষিণ ধার বলিতে বচন | শাখা সুখা তের দলুই উঠিল তখন || মহাবীর কালুসিংহ চারিপানে চায় | উ-পারেতে লাউসেন ঘোড়ারে বুঝায় || পার হয়্যা যাব গঙ্গা অজয়ার জল | নারিবি পারিবি ঘোড়া সত্যভাবে বল || এত শুনি বলে ঘোড়া অন্ডির পাখর | অবধানে শুনহে দুর্লভ সদাগর || তুমি মোর রাউত বাহন আমি সই | আর যদি কেহ বলে তার তনু লই || মোর পিঠে রাউত হইয়া রহ থির | এক লম্ফে দেখিব আকাশ গঙ্গাতীর || তবে যদি নদীপার না করি এখন | ঘোড়া হয়্যা রই যেন শতেক জনম || এত শুনি রাউত চিন্তিল করতার | লম্ফ দিয়া রাউত ঘোড়ার আশোয়ার || আগু পিছু বার চারি চেরাক ফান্দনি | চাবুক মারিতে নিল আকাশ সরণি || পার হয়্যা যায় তবে ময়না রাজন | সপ্তম পাতালে যায় করি আরোহণ || হেঁটমুখে আছিল উপরমুখে চায় | মনে করে ঐরাবতে ইন্দ্রপারা যায় || গরুড়বাহনে পারা যায় নারায়ণ | কি জানি বিধাতা যায় মরালবাহন || তবে পাছু চিনিল লাউসেন মহাশয় | আপনি দক্ষিণ ধার কাটিল অজয় || তাহার উপর পড়ে সারিয়া হাঁফাল | জলেতে ভাসিল ঘোড়া ভাঁজিয়া জোয়াল || জোয়াল ভাঁজিয়া ঘোড়া জলে ভাস্যা যায় | হেনবেলা লাউসেন বলে হায় হায় || ভাসিতে ভাসিতে ঘোড়া ডাক দিয়া বলে | ছ মাস লইয়া তোমা ভাস্যা যাব জলে || বলিতে বলিতে ঘোড়া করে জলপান | সর্ব তনু ডুবিল সজাগ দুই কান || পাতালে অজয়নদী ভাবে মনে মন | মকর কুন্তীর মাছ পাটায় তখন || হেন বেলা দেখা দিল আপনি বাসুকি | বজন উপরে বিষ জ্বলে ধিকি ধিকি || আট তোলা বিষ দিল সিন্ধুজার গায় | অকালে মরিল ঘোড়া পড়িল আপায় || অন্ডির পাখর অশ্ব গেল যমঘর | জলে ভাসে লাউসেন দুর্লভ সদাগর || বিপত্ত পড়িল বড় নাঞি দেখে কুল | জলে যেন ভাসিল সোনার পদ্মফুল || ভাস্যা যায় তরঙ্গে ময়নার বীরবল | অজয়া দিলেক তার চরণে শিকল || লাউসেন হৈল বন্দী সপ্তম পাতালে | নহিল ধর্মের পূজা সর্বলোক বলে || হেনবেলা বৈকুন্ঠে জানিলা নিরঞ্জন | পাঠাইয়া দিল বীর পবননন্দন || মনোগতি যায় বেগে মনে নাঞি ভয় | বচন বলিতে শীঘ্র পাইল অজয় || কোপে কম্পমান হনু চায় চারিপানে | সাত তাল বন্যা বীর ভরে বাম কানে || ডানি কানে ভরে নিঞা চৌতাল বালি | কলধৌত কমল কলিকা রসকলি || মাঝদহে ঝাঁপ যদি দিল বীরবল | দেখিতে দেখিতে হৈল এক আঁঠু জল || বিশেষ বৈশাখ মাসে পড়ে বড় খরা | অজয় নদী বলে প্রাণ হারাইনু পারা || লাউসেন অজয় নদা দেখিল তখন | হনুমানের কাছে আসি দিল দরশন || সমুখে লাউসেন বীর জুড়ি দুইহাথ | সবিনয়ে কহিলেন বীরের সাক্ষাত || জীবজন্তু জল বিনে মরিল সকল | শুন্য হৈল অবনী সংসারে নাই জল || এত শুনি হনুমান মনে হরষিত | সাত তাল বন্যা তবে দিলেক তুরিত || অজয়া দিলেক ঘোড়া অন্ডির পাখর | লাউসেন বিদায় হৈল ঢেকুর উপর || দক্ষিণ ঢেকুর গড়ে করিল মোকাম | রাবণ উপরে যেন বস্যা রঘুরাম || শিঙ্গা কাড়া টমক নিশান জয়কার | কালু ডোম শাখা সুখা বলে মার মার || দশমতি দিবসে দিনের পালা সায় | ধর্মের মঙ্গল দ্বিজ রূপরাম গায় || এইখানে থাকে গীত ধর্মের মঙ্গল | দানপতি লয়্যা ধর্ম করিবে কুশল || . ****************** || অনুমৃতা পালা সমাপ্ত || . এই পাতার উপরে . . . মিলনসাগর |
