| রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্য |
| রূপরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের সূচি |
| ঘোড়া দিব বকশিস্ বলিল সাতবার | তবে কেন বস্যা বাপু লাউসেনকুমার || মনের প্রত্যয় মাগি পুনর্বার কয় | সভামধ্যে পরীক্ষা করিলে হয় নয় || মাতুলের বাক্য শুনি মনে চিন্তা নাই | কংসের সমুখে যেন কৃষ্ণের বড়াই || অন্তরে আতর রাখে ময়নার রায় | জামাজোড়া ছিল গায় খসাইল তায় || মল্লবেশ ধরিল ময়নার তপোবন | গলে মাল্য শোভা করে অঙ্গেতে চন্দন || পরম সুন্দর বালা পরিপূর্ণ সাজে | তরণি দেখিয়া রূপ নিরোধিল লাজে || বিপর্যয় বিষম বিক্রম মধুমদে | যেমন কৃষ্ণের বেশ কুবলয়বধে || গুঞ্জার মালতী গলে আজানুলম্বিত | ভীমের সমান বল কিম্বা ইন্দ্রজিত || মধুপানে মাতঙ্গ দ্বিগুণ হয়্যা আছে | সিংহের সমান বীর গেল তার কাছে || সভা হৈতে লাউসেন সরণে পশিল | থুড়িলাফে হস্তী গোটা ত্রিবার লঙ্ঘিল || সকল সংসার দেখ্যা বিস্ময় মানিল | সভাতে পাত্রের মুন্ডে বজ্জর পড়িল || পূর্ণঘটা হইল দরবার বিচক্ষণ | মনে করে কদাচ না মনুষ্য এজন || মনুষ্য সকল কান্দে মুখপানে চায়্যা | যুবতী পুরুষ কান্দে সকাতর হয়্যা || লম্ফ দিয়া লাউসেন আইল হেনকালে | মুটকি হানিল গিয়া হস্তীর কপালে || ডাক ছাড়ে বিরূপ পালায় দশহাত | আন্ধার দেখিল হস্তী বাজিল নির্ঘাত || পুনরপি হস্তী ঝিঁক্যা দিলেক মাহুত | সমুখে আসিল তবে লাউসেন রাউত || ঐমনি বসায় দাঁত লাউসেনের গায় | বসুমতী ভেদিয়া রাখিতে তারে চায় || দশনে উঝালে মহী পায় চাঠাচাঠি | মত্ত বৃষ আড়ালে উঝালে যেন মাটি || অজ্ঞান হইল বীর কুঞ্জরের কোলে | শুন্ডে ধরি লাউসেন কাছাড়িয়া তোলে || দাবানল সদৃশ সামালে লাউসেন | সেইক্ষণে সামালি হস্তীকে ঢেস দেন || মাথায় অঙ্কুশ মারে মাহুত সঘন | বুদ্ধিবলে প্রতিকুলে করিতে নিধন || শিখরে কাঁপিল সিংহ কুঞ্জরের ডাকে | বসুমতী বিধাতা বসাল্য যেন চাকে || লাউসেনের গায় হস্তী হেলাইয়া দেই | কালান্তক যম যেন দেখাদেখি নেই || হাথাহাথি লাউসেন হস্তীসঙ্গে লড়ে | ফলঙ্গ সারিয়া পাছু দশহাথ পড়ে || ঘন ঘন লয় দেই উলটি পালটি | বন বন শব্দে দুপায় তৃণা কুটি || চলিতে যুঝিতে যেন উগ্রচন্ডা চলে | গৌড়েশ্বর বারভূঞা ধন্য ধন্য বলে || ইত্যাদি সকলে বলে দেখি চাঁদমুখ | হাপুতির বাছাকে ভূপতি দেই দুখ || সরণে সরণগতি নাচে লাউসেন | মাহুত মাতাল হস্তী হুলাইয়া দেন || মাথায় অঙ্কুশ কাল দুহাথে বাজায় | জীবনে কাতর হয়্যা তবে আগু যায় || লাউসেন মারিতে যায় সারিয়া আরতি | মনে করে বিন্ধিয়া রাখিব বসুমতী || গর্জনে গগন কাঁপে মহীপানে চায় | পাত্র ভাবে লাউসেন যমঘর যায় || সিংহের বিক্রম বীর শঙ্কা নাই করে | লম্ফ দিয়া দুই হাথে করিশুন্ড ধরে || হস্তী আর মনুষ্য পড়িল ঠেলাঠেলি | ঐরাবত-ভীমেতে যেমন বলাবলি || দুহাথে ধব়্যাছে দড় হস্তীর দশন | বলাবলি বিপর্যয় পড়িল তখন || পায় চাঠে লাউসেনে পাতাল চায় নিতে | ঐমনি সারিয়া বীর উঠে আচম্বিতে || লম্ফ দিয়া হস্তীর মাথায় গিয়া বৈসে | রক্তপান করিতে কেশরী যেন রোষে || সরণ সাধনে হৈল সারথি অনিল | কেশে ধরি ঐমনি মাহুতে দিল কিল || কপালে মুটকি হানি মাথা কৈল চুর | মাহুত মরিল দেখে গৌড়ের ঠাকুর || হস্তীর মাহুত মৈল দেখে সর্বজন | দ্বিজ রূপরাম গান দৈমন্তীনন্দন || একমনে শুন সভে ধর্মের কীর্তন | লাউসেন-কুঞ্জর যুদ্ধ অপূর্ব কথন || মাহুত বিহনে গজ হৈল মহীলতা | লাউসেনের ধর্ম সত্য সাক্ষাত দেবতা || অতিশয় মাতাল ঐমনি জাঁকে গজ | রুধিরে বিটঙ্ক কুম্ভ অব্যয় পঙ্কজ || কেশরী কাঁপিল কাল শব্দ বিপর্যয় | কৌশিক কোদন্ড চালি অবিধানে রয় || অবতার লাউসেন সংসার মনে করে | বিশাল বিক্রম দেখি চিত্রলেখা ডরে || ধন্য ধন্য লাউসেন বলে সর্বজন | মাতুল আরতি বীর জুড়িল সরণ || বিরূপাক্ষ সরণ বিষম বিসম্বাদ | রাজার সমুখে শব্দ যেন সিংহনাদ || বসুমতী সমুখে উপরে হানে কিল | দুরদুর শব্দ ঘোর যেন ধারা শিল || কেহ বলে চিকুর চৌখার দেখি চক্ষে | মল্ল লাউসেনে দেখি ত্রাস লাগে বুকে || লম্ফ দিয়া গগনে পঞ্চাশ হাথ উঠে | প্রতিকুল অসুর দেখিলে বল টুটে || আগু পাছু দেই ঘন হাথিকে বাউলি | তাড়িয়া ধরিল শুন্ড সঞ্চার বিজুলি || অবিহিত কুঞ্জর মানুষে যুদ্ধ হয় | নড়্যা বৈসে ভূপতি নিকটে নাঞি রয়|| ত্রাসে বারভূঞা সভে পাছুয়ান হৈল | পাত্র ভাবে এবার ভাগিনা পারা মৈল || দুই যাম লাউসেন হস্তীসঙ্গে যুঝে | দুই দন্ত দারুণ ধরিল দুই ভুজে || যুগ যোধা মাতিল মরণ নাই মনে | অকালে সম্ভাষ যেন পাবক অর্জুনে || অনন্ত বাসুকি কাল গভীর গর্জন | দন্ত মেলি মাতঙ্গ উঠিছে ঘনে ঘন || লাউসেন উপরে সঘনে মারে শুঁড় | বিবাদ বিষম যেন তেজেতে গরুড় || ঐমনি রাখিতে চাহে এ চারি চরণ | সেনেরে বিন্ধিতে চাহে বসুমতী সনে || পায়ে ধরি পর্বতে পেলিতে যেন চায় | দুই বীর ধরাধরি ঘুরিয়া বেড়ায় || দড় দড় দশনে দরিল লাউসেন | আলগোছে মাতঙ্গ ধরিয়া পাক দেন || মহী হৈতে তুরিতে তুলিয়া নিল গজ | বোলচাল নাহিক মুখেতে উঠে রজ || কপিলার দুগ্ধ স্মরে বীর হনুমান | এহাকে অধিক বীর কে আছে সিয়ান || কুঞ্জর তুলিল বীর অনাদ্যের বরে | শিশু যেন মার্জার সহিত খেলা করে || একবার মাতঙ্গ তুলিল বাম করে | বাম হস্তে কৃষ্ণ যেন গোবর্ধন ধরে || অতঃপর মহীতলে পেলে কাছাড়িয়া | গগনমন্ডলে পুন উঠে লম্ফ দিয়া || . ****************** . হস্তিবধ পালার পরের পৃষ্ঠায় . . . . পাতার উপরে . . . মিলনসাগর |
