| রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্য |
| রূপরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের সূচি |
| চৌবেড়া বেড়িল পাত্র ময়না অবনী | শাখাবীর পড়িল তোমার চূড়ামণি || কাল ঘুমে কাতর হয়্যাছে তোর পিতা | তোমা বিনে কেবা রাখে ময়না বিতথা || আপনি কাটিল তার তিন লক্ষ সেনা | শোকে তনু কাতর কেমনে দিব হানা || পরোক্ষ তোমার কথা শুনি অবিরত | মনে করি সুখাবীর সাক্ষাত সুরথ || সুখা বলে জননী মরমে পাইলে দুখ | ধর ধর শবদে সিঙ্গায় দেই ফুক || সাজ সাজ শবদে সঘনে বাজে কাড়া | ঘোষণা পড়িল কালু ডোমদিগ্যের পাড়া || তের দলুই সাজন করিল তড়বড়ি | সুখবীর কোমর বান্ধিল কড়াকড়ি || কেহ নাহি ফিব়্যা চায় স্ত্রীপুত্রের মুখ | ঐমনি ধারিল রণে ধরিয়া ধনুক || নদীপার হয়্যা আইসে যত রাজসেনা | তের দলুই সুখাবীর রণে দিল হানা || এক আঁঠু জলেতে বাজিল হানকাট | ঘুরুন্যা বাতাস পারা ঘুব়্যা বুলে ঠাট || কুলকুল শবদে সঞ্চরে খোলা বালি | গোলার শবদ শুনি কানে লাগে তালি || দক্ষিণ দরিয়া গুরু দুই বাঁশ জল | ঘোড়ার সহিত কেউ যায় রসাতল || আথলে পড়িল হাথি সিফাই সহিত | সুখাবীর সমরে সাক্ষাত ইন্দ্রজিত || হানে কাটে দুহাথে হেত্যার কাল যম | হস্তীর উপরে যেন সিংহের বিক্রম || বাঘরায় রণে যুঝে আর কালচিতা | একেক পাটনে রাখে তিন গজ মাতা || কাল্যাসোনা যুদ্ধ করে যেন মেঘনাদ | পাটনে ছাইল মহী এ বড় প্রমাদ || বিলা ডোম যুদ্ধ করে আর বেড়াজাল | অকাবে অবনী যেন অবতীর্ণ কাল || বিশাল বাজনা ঘোর বাজিল বিরুপ | সিংহের সদৃশ সৈন্য পড়ে ঝুপঝুপ || দুহাতে হেত্যার ধরি উভ অসি হানে | গড়াগড়ি যায় হাথি ঘোড়া চারিপানে || দুই দলে সংগ্রাম বাজিল দড়দড় | আগু হৈল সর্দার সিফাই বড় বড় || রণমদে মাতিল যতেক ডোমগণ | রাজার অর্ধেক সেনা করিল নিধন || সংগ্রাম সমুখে কার মনে নাঞি ভয় | পালাইল রাজসেনা না হইল জয় || রণ জিন্যা তের দলুই বাড়ীকে গমন | কালিনী গঙ্গার ঘটে দিল দরশন || সুখাবীর বলে ভাই শুন কালচিতি | স্নান কব়্যা চল ভাই শুদ্ধ হয়্যা মতি || বিলা ডোম বলে ভাই সুখা ভাল বলে ? দারুণ শরের জ্বালা নিবারিব জলে || ঘাটে রাখে বসন হেত্যার চন্দ্রবাণ | মাঝদহে নাম্বিল সলিলে করে স্নান || হেন বেলা গোদা পাকি নদীকুলে ছিল | সন্নিধানে ডোমদিগ্যের হেত্যার দেখিল || গোদা পাকি ঐমনি হেত্যার চুরি করে | গুঁড়ি গুঁড়ি পালায় আপনি কাঁপে ডরে || কত দূরে গোদা পাকি ডাক দিয়া ভাষে | হেত্যার করিল চুরি রণ দিবে কিসে || তরাসে চঞ্চল ডোম ঘুব়্যা বুলে তড়া | হেনকালে মহাপাত্র পাইল ঢাল খাঁড়া || মার মার ডাক ছাড়ে মাতঙ্গ উপর | আগু হৈল রাজসেনা চারিদিগে চর || দুরন্ত পাটন পড়ে ডোমদিগ্যের গায় | হিমালয়ে জলের পশলা যেন বায় || শাঙ্গ শেল অবতীর্ণ সলিল সরণি | শরে শরে সেতুবন্ধ সাক্ষাত আপনি || তীর গুলি পড়ে কত ডোমের নিয়ড় | সুখাবীর তের দলুই গেল যমঘর || তের দলুই সুখা মৈল ক্ষেম ধুতি খায়্যা | কালির জামাঞি মৈল অভ্যাগত হয়্যা || বারতা পড়িল তবে তের দলুই মৈল | কেহ বলে ডোমদিগ্যের সর্বনাশ হৈল || সুখাবীরের মরণে উঠিল হাহাকার | ইন্দ্রজিত নিধনে যেমন চমত্কার || হায় হায় শব্দ যেন সুখার মরণে | সেই ঘোর শব্দ হৈল ময়না ভুবনে || গড়াগড়ি কান্দে লখ্যা ময়নার গড়ে | শোকে হয়্যা পাগল স্বামীর পায়ে পড়ে || শাখা সুখা তের দলুই গেল যমঘর | রণে চল প্রাণনাথ না হয়্য কাতর || চল চল প্রাণনাথ সমরে তুরিত | রাবণ সাজিল রণে মৈল ইন্দ্রজিত || কৃষ্ণের ভাগিনা মৈল সুভদ্রানন্দন | যার তরে অর্জুন করিল প্রাণপন || হেত্যার বান্ধিয়া যদি তুমি যাহ রণে | বারভূঞা এখনি পালাব বনে বনে || জগতে জীবন ধরি যত কাল জিব | লাউসেন রাজার লোন এবার শুধিব || তুমি রণে গেলে আমি ঘরে না থাকিব | হেত্যার ধরিয়া হাথে পাছু গোড়াইব || এত শুনি বীর কালু সত্বর পয়ান | সমরে চলিল বীর হাতে টাঙ্গিখান || গড়ের বাহিরে গিয়া দিল দরশন | কালিনী গঙ্গার ঘাটে করে নিরীক্ষণ || কালু টাঙ্গি হাথে চারি পানে চায় | নব লক্ষ রাজসেনা দেখিবারে পায় || দলবল রাজার যতেক ছিল সেনা | বীর কালু দেখিয়া সভাই এড়ে থানা || লস্কর চঞ্চল হৈল কালুসিংহ ডরে | পদ্মপত্রে জল যেন টলমল করে || ধানুকা ধনুক রাখে ঢালী রাখে ঢাল | ওতে-ঘাতে পাকি বৈসে কালু হৈল কাল || কামানী কামান রাখে বন্দুকী বন্দুক | মহীলতা পারা যেন সর্দারের মুখ || সিংহ দরশনে যেন কুঞ্জরের ত্রাস | গরুড় সমুখে যেন ভুজঙ্গ বিনাশ || দাহানলে যেমন ব্যাকুল কৃষ্ণসার | ততোধিক বারভূঞা সিফাই সর্দার || ধর্মের আজ্ঞায় ধর্মের দাস গায় | পলাসনের বিলে যারে হৈলে বরদায় || একমনে শুন সভে ধর্ম ইতিহাস | দুমন করিলে হয় ধনপুত্রনাশ || মহাবীর কালুকে দেখিল সর্বজন | দরবারে বসিল পাত্র বারভূঞাগণ || বড় বড় খনক সিফাই মিঞা বৈসে | কেহ বলেবীর কালু পার হয়্যা আইসে || এখনি হানিব হাথি যেন হিমালয় | কলিযুগে এহার সমান কেবা হয় || তরাসে রাজার সেনা হৈল সভাসন | পাত্র বলে শুন সভে আমার বচন || যেজন আনিয়া দিব কালুবীরের মাথা | তারে দিব ময়না রাজতিদন্ড ছাতা || আর দিব ইনাম মাণিকরাজ হাথি | কলিঙ্গা ইনাম দিব কানড়া রাউতি || গৌউড়ে বাড়াব তারে ভুপতি সমান | এত বলি দরবার ভিতরে রাখে পান || এত শুনি লস্করে পড়িল কানাকানি | হেন বীর আছে গড়ে এহা নাঞি জানি || আনে বলে কেবা আছে হেন সিংহরথ | কালুর সমুখ দিয়া চল্যা যার পথ || যারে দেখি অঙ্গের রূধির উড়্যা যায় | তার মুন্ড আনিবারে কেবা দেই সায় || কেহ বলে ইনাম মাহিনা কার্য নাঞি | ভিক্ষা মাগি অন্ন খাব যে করে গোসাঞি || কি হইবে দূর কর ই সব জঞ্জাল | পরিবার পুষিব পরের ধব়্যা হাল || . ****************** . জাগরণ পালার পরের পৃষ্ঠায় . . . . পাতার উপরে . . . মিলনসাগর |
