| রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্য |
| রূপরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের সূচি |
| লোহার শিকল বান্ধা বিটঙ্ক বিহর | অবিলম্বে আনিল কালুর বরাবর || রাত্রি করে দিবস দিবস করে নিশা | বীর কালু দিল তারে মান দহি খাসা || দোসর পটুকা দিল মাথার পাগড়ি | কত যুগ নেহাল হইয়া গেল শুঁড়ি || সাত ঘড়া মদ নিল ডোম সাত জন | সাট্যা দীঘির পূর্বঘাটে দিল দরশন || চাঁপাকলা চিনি খন্ড গঙ্গাজল নাড়ু | পদ্মচিনি পরিপূর্ণ পুরটের গাড়ু || কাল্যাসোনা তখন পূজার করে স্থল | পঞ্চরস পরিপাটি পুণ্য গঙ্গাজল || অখন্ড কদলীদলে পিঠা আর ভাত | ঝালে ঝোলে বকাল ব্যঞ্জন ছয় সাত || অপরূপ রচিল বালির দশভূজা | মদ মাংসে বীর কালু করে দেবীপূজা || সভামধ্যে বসাইল মদের কলসি | উপরে চন্দন মাল্য সিন্দুর সরসি || জবাঙ্কুর হাথে বৈসে যত ডোমগণ | ভক্তিভাবে পূজা করে ভবানীচরণ || হেনবেলা কৈলাসে জানিল হৈমবতী | বীর কালু পূজা করে ময়না বসতি || অবশ্য দেখিব পূজা এই অভিলাষ | ময়না নগর পাইল রাখিয়া কৈলাস || বিষ্ণুপদতলে পূজা দেখিল ভবানী | কালুর দেখিয়া পূজা বলেন আপনি || শুন পদ্মাবতী সখি আমার বচন | ঐ দেখ পূজা করে ডোমের নন্দন || কল্পনা রাখিয়া কালুডোমে দিব বর | অধিকার দিব কিছু ইন্দ্রের উপর || এত যদি পদ্মাকে বলিল হৈমবতী | মহাবীর মহাপূজা মন সমগতি || চৌদিগে ডোমের ঘটা মধ্যে মহাবীর | নানা উপহার মধু মকরন্দ ক্ষীর || মকর মল্লিকাতুল্য অপূর্ব উদন | বাণ বিন্দু বর্ণ পিঠা বকাল ব্যঞ্জন || পাঁচ ভাজা পরিপাটি পুরটের থালে | মাংসের ব্যঞ্জন মধু পরিপূর্ণ ঝালে || মধ্যখানে মদের কলসি মনোহর | একমনে পূজে কালু ডোমের কুঙর || সুবুদ্ধি কালুকে তবে কুবুদ্ধি ধরিল | ঈশ্বরী পিরিতে মধু নাহি নিবেদিল || পূজা পূর্ণ হৈতে নাঞি করে বিলম্বন | মদ মাংস দেখিয়া ধরিতে নারে মন || চঞ্চল হইল মতি দৈব নহে বশ | রসনা শিখরে কিছু সঞ্চারিল রস || কপাল বিরূপ হৈলে সঞ্চয়ে আপায় | বীর কালু সব ত্যাজি মদ মাংস খায় || ভবানীর নামে নাঞি দিল পুষ্পজল | শখা সুখা ডোম আদি মাতিল সকল || লুট কব়্যা খায় মদ মাংস ভাজা পিঠা | মনে সুখ জন্মিল মদের মুখে মিঠা || ভাই ভাই বলি কেহ কার দেই মুখে | হাজার হাতির বল বাম হাতে রাখে || কালুর বদনে মই দেই পাঁচজন | আবেশে হইল বীর অবধূত মন || তের দলুই শাখা সুখা হইল অজ্ঞান | বিমানে বসিয়া দেবী দেখিবারে পান || কোপে কম্পমান দেবী নয়ন রাতুল | বদন অরুণ হৈল যেন বজ্রফুল || মরমে বাজিল দুঃখ লাজে হেঁটমাথা | পদ্মাকে বলেন কিছু বিশেষ বারতা || পুরুষে পুরুষে কালু মোর পূজা করে | আজি কেন সেই কালু আমাকে পাসরে || এহার উচিত আমি দিব অভিশাপ | বাসমণি পতঙ্গ পাবকে যেন ঝাঁপ || এই পূজা কালু যেন করিল নৈরাশ | তেমনি কালুর আজি হকু বংশনাশ || অভিশাপ দিয়া দেবী গেলেন তুরিত | তমোগুণে নষ্ট যেন হৈল পরীক্ষিত || নাএকেরে ধর্ম তুমি হবে বরদায় | রূপরাম ফকির আসরে গীত গায় || অজ্ঞান হইল কালু ডোমের নন্দন | অর্জুনের শক্তি হব়্যা নিল নারায়ণ || ঢুলিতে ঢুলিতে কালু চল্যা চল্যা যায় | শুঁড়িদিগের ঘরে গিয়া মদ খাত্যে চায় || মধুপান করি তার মুখে নাঞি বোল | ডুমনী ভাবিয়া শুঁড়িনীর মাগে কোল || আজি কেন হেথা দেখি শাখা সুখার মা | তোর মুখ চায়্যা লো ধরিতে নারি গা || বিপর্যয় বচন বলিতে বলে কি | চারিদিকে পালায় শুঁড়ির বহু ঝি || জাতি লয়্যা শুঁড়ির বেটী উঠ্যা দিল রড় | যেখানে আছিল লখ্যা সামন্ত ঝকড় || ধর্মপূজা করে যথা লখিয়া ডুমনী | ডাকিয়া দোহাই গিয়া দিলেক শুঁড়িনী || সকল ছাড়িয়া বীর পাপে দিল মন | যেই মহাপাপে মৈল রাজা দশানন || অন্য দিন দেখা হৈলে মাসী বল্যা যায় | আজি কেন ডোমের বেটা আলিঙ্গন চায় || এত শুনি ডুমনী চরণে করে বর | এক লাফে উত্তরিল শুঁড়িদিগ্যের ঘর || দেখিল জীবনধন গড়াগড়ি যায় | হাত পসারিয়া লখ্যা নিল প্রেমদায় || বদনে বদন দিয়া সবিনয় বাণী | ডোম লয়্যা নিজ ঘর আইল ডুমনী || অজ্ঞান হইল বীর জ্ঞান নাহি পায় | লখ্যার দুহাথ ধরি দিলেক মাথায় || আড়মদ মাতাল বচন অবহেলা | গড় করে লখ্যাকে পায়ের লয় ধূলা || হাদে লো ডুমনী তোরে দাঁতে কুটা করি | তোর হাতে সমর্পণ ময়না নগরী || খাসি মোর মাথা লখ্যা খাসি মোর মাথা | ইন্দ্র আইলে হানা দিবে আনে কোন্ কথা || আমি জানি ডুমনী তোমার যত বল | থুড়ি লাফে লঙ্ঘ্যাছিলে সরস্বতীর জল || যখন আইবড় ছিলে মা বাপের ঘরে | ষোল সাঙ্গের পাথর তুলিলে বাম করে || টাঙ্গি দিয়া কাট্যাছিলে চোদ্দ গাছ তাল | এক শরে বিন্ধ্যাছিলে কুড়ি ভেড়ার ছাল || উড়া শর এড়্যাছিলে গগনমন্ডলে | দক্ষিণে পড়িল গিয়া সমুদ্রের জলে || হেত্যার বান্ধিয়া রাখ দক্ষিণ ময়না | রাত্রি পোহাইলে তোর কানে দিব সোনা || শঙ্খ দিব সোনা দিব তসরের শাড়ি | কুলা পাথি ধুচনি বেচিব বাড়ী বাড়ী || আমানি মাগিবে কত আর পান্ত ভাত | আর কত সদাই বুনিবে তালপাত|| পশ্চিমউদয় দিয়া যদি সেন আইসে ঘরে | ঘুষিব তোমার গুণ সভার ভিতরে || লখ্যা বলে প্রাণনাথ মোর নিবেদন | রাখিতে নারিব রাজ্য ময়না ভুবন || যৌবন গরবে ভূমে না পড়িত পা | এখন হয়্যাছি আমি তের ছেল্যার মা || ধরণী ধরিয়া উঠি বিস্তর যতনে | পাকিল মাথার কেশ শঙ্খের বরণে || মলিন হইল ইবে নয়নের তারা | আকন্দের বদলে মাকন্দ হৈল হারা || সর্বকাল নাই থাকে পুরুষের বল | সময়ে পীযুষ হয় সাপের গরল || সবিশেষ তোমার সাক্ষাতে নিবেদন | রাখিতে নারিব রাজ্য কহিল বচন || এত শুনি বীর কালু করে হায় হায় | যুবতীর শিশুকথা সহা নাঞি যায় || বেটা হৈল সতন্তর জায়া হৈল আন | কত আর পরের সহিব অপমান || . ****************** . জাগরণ পালার পরের পৃষ্ঠায় . . . . পাতার উপরে . . . মিলনসাগর |
