| রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্য |
| রূপরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের সূচি |
| তাঁত বুনে তাঁতিভায়া ঘন মাথা নাড়ে | চক্ষে লাগে নিন্দাটি পড়িল তাঁতগাড়ে || কাক পাখি কোকিল ঘুমায় বস্যা ডালে | মকর কুম্ভীর মত্স্য নিদ্রাগত জলে || অনিলে নিন্দাটি লাগে সভাকার গায় | ইক্ষুবনে গড়াগড়ি জম্বুকী ঘুমায় || নিন্দাটি পড়িল যদি ময়নার গড়ে | সবেমাত্র জাগে লখ্যা সামন্ত ঝকড়ে || ধর্মপূজা ডুমনী করিছে রাত্রিদিনে | অতেব নিন্দাটি তার না লাগে নয়নে || অচেতন হৈল রাজা ময়না ভুবন | ময়না ভুবনে চোর দিল দরশন || বার গন্ডা পথ দেখে তের গন্ডা ঘাটি | কাএস্তের পাড়া দিয়া আইল তেলিবাটী || ঘরে জ্বলে প্রদীপ বাহিরে লাগে আলা | দূরে হৈতে চোর দেখে ঘটি বাটি থালা || ধন দেখি পরের ধরিতে নারে হিয়া | কেন হৈলুঁ চাকর আপন মাথা খায়্যা || রাজা হৈল দুরন্ত দুঃখের হৈল জাল | পরাধীন জীবন বঞ্চিব কতকাল || অথবা এসব ধন নিতে পারি ছলে | ঐমনি ভাসিল চোর নয়ানের জলে || সারাদিন ধায়্যা বুলি সের ধান্য তরে | ধিক যাকু পরের যেজন আশা করে || গড়াগড়ি অন্ধকারে সুবর্ণ চাঙ্গড়া | দরশন দিল গিয়া ডোমদিগের পাড়্যা || ধর্মপূজা করে তথা লখিয়া ডুমনী | চোরের পাইল তবে চরণের ধ্বনি || ধর্মপূজা রাখিয়া ডুমনী মনে করে | কোথা হইতে কেবা আইল মোর অন্তঃপুরে || অইমনি ডুমনী ধরিল ঢাল খাঁড়া | হান হান করিয়া তস্করে দিল তাড়া || ইন্দ্রজাল প্রতি ছিল ভবানীর বর | অবিলম্বে বই হৈল ময়না নগর || দেখিতে দেখিতে পার কালিনীর জল | সাক্ষাতে দেখিল চোর দেবতার বল || নব লক্ষ সৈন্য ছিল পদুমার বিলে | সভামধ্যে আসিয়া তস্কর কিছু বলে || বারভূঞা উভদলে গৌড়ের পাতর | হেনবেলা বলে গিয়া তার বরাবর || চোর বলে দূর হৈল চতুরালিপনা | আজ্ঞা কর ময়না বেড়ুক রাজসেনা || একজন বলিতে সহস্র জন ধায় | হাথি ঘোড়া পদাতি নড়িল পায় পায় || নিঃস্বরিল ঢালী পাকি ঢালে দিয়া মাথা | চারি পাঁচ ধানুকী একেক ঢালে গাঁথা || দশ মুখে ভাঙ্গিল রাজার দলবল | দুরদুর পারাল্য কালিনী গঙ্গাজল || ওতে-ঘাতে বসিল ধানুকী চারি পাঁচ | কালিনী গঙ্গার জলে মুড়াইল মাছ || সাত গড় ময়নার বেড়িল কানে কানে | বীর কালু লখিয়া ডুমনী নাঞি জানে || রাউত মাহুত সভে কানাকানি কয় | গুঁড়ি গুঁড়ি লখ্যার তরাসে পখ বয় || চৌদিগে ঘিব়্যাছে রাণা মগল পাঠান | সিন্দুরিয়া কাদম্বিনী হস্তীর চাপান || দক্ষিণে দিলেক থানা হাসন হুসন | দুরন্ত সিফাই সঙ্গে যমদরশন || হাজার হাজার সঙ্গে আছে বেলদার | উচনীচ জাঙ্গাল করিছে সমসার || বড় বড় গাছ আনি দব়্যায় ভাসায় | উপরে তুরঙ্গ হাথি পথ বায়্যা যায় || দুই কুল ডাঙ্গা বান্ধে ঝোরঝার খানা | তার কাছে মগল পাঠান নিল থানা || ফরিকাল উত্তরিল উপরে ধানুকী | বেনাঝড়ে গতি যেন করিল জম্বুকী || পশ্চিম দুয়ারে থাকে খানসামা কাজি | তাহার ভিড়নে রয় বিস হাজার তাজী || বিশাশয় কামানে পুরিল বড় গোলা | যার শব্দ অনুশীলে চঞ্চল অচলা || বড় বড় গাছ কাটে ছুতার কামার | পথ করে চৌদিগে বেগারি বেলদার || শুখান ব্যাউড় বাঁশে ভেজায় আগুন | শাল তাল নিম কাটে তেঁতুলি অর্জুন || হাথি ঘোড়া দুরন্ত চৌদিগ থানা দেই | গুরুতর নিয়ড়ে কামান কেহ লেই || উত্তর দুয়ারে থানা নিল গজপতি | রামরায় রূপসেন যাহার সংহতি || তার আগে থানা লেই নৈ হাজার ঘোড়া | আশি হাজার ঢালী সঙ্গে বর্ণ কালা কড়া || পূর্ব দুয়ারে মহাপাত্র নিল থানা | পালাবার পথ নাই চতুর্দিগ খানা || দক্ষিণ দুয়ারে বড় উত্তরে জঙ্গল | তায় গিয়া থানা নিল পাঠান মগল || তার কাছে থানা নিল আশি হাজার ঢালী | টেড়ি কব়্যা পাগ বান্ধে রাঙ্গাঘটা বালি || হাথি সব গড় ভাঙ্গে দারুণ দশনে | দিশাহারা হয়্যা কেহ বুলে বাঁশবনে || দুরদুর খসায় পাথর জগদল | বিনতানন্দন অরি চরণের তল || হাতি ঘোড়া পদাতি বেড়িল চারিপানে | বীর কালু লখিয়া ডুমনী নাঞি জানে || ধানুকী রহিল সব জুড়িয়া ধনুকে | হাথি ঘোড়া পদাতি রহিল মুখে মুখে || গাএ গাএ রহিল রাখিতে নাহি তিল | অকস্মাত অবতীর্ণ অকাল অনিল || কুঞ্জরে সিফাই যেন সাজে চন্দ্রকলা | অনুভাবে অবনী আপনি হৈল আলা || ময়না নগর তবে করে টলবল | বৈকুন্ঠে জানিল ধর্ম ভকতবত্সল || শুন হনুমান বীর আমার বচন | আজি রক্ষা কর গিয়া ময়না ভুবন || বীর কালু নিদ্রাগত চৌকির উপর | বিপাকে মজিল রাজ্য ময়না নগর || নব লক্ষ সৈন্য লয়্যা গৌড়ের নাবড় | চৌবেড়ে বেড়িল সাত ময়নার গড় || তুমি তারে সপনে বলিবে সমাচার | যুদ্ধ কব়্যা ময়না রাখুক এইবার || চল চল হনুমান না কর বিলম্ব | রামরাজা তোমার জানেন বীরদম্ভ || পিতা তোমার পবন অঞ্জনা তোমার মা | এত শুনি উলসীত হনুমানের গা || প্রণাম করিল বীর অনাদ্যের পায় | বচন বলিতে হৈল ময়না বিদায় || শমন জিনিয়া হরি বিষ্ণুপদতলে | দেখা দিল ময়না কালিনী নদীকুলে || কালুর শিয়রে তবে বৈসে হনুমান | মনে হৈল ডোমের বেটা কালঘুম যান || গা তোল গা তোল বলি সপনে চিয়ান | অকালে ময়না মজে হবে সাবধান || এবার যুঝিয়া রাখ দক্ষিণ ময়না | গৌড় হৈতে মহাপাত্র দিল আসি হানা || তুমি শীঘ্র হেত্যার বান্ধিয়া যাহ রণে | লাউসেনের বিপত্ত পড়িল এতদিনে || কালরাত্রি নিশাভাগে না করিবে ভয় | দেবী পূজা কর গিয়া রণে হবে জয় || দুঃখবিনাশিনী দেবী পূজ একমনে | অর্জুন করিল পূজা কৃষ্ণের চরণে || এত বলি হনুমান করিল গমন | উঠিয়া বসিল কালু হয়্যা সচেতন || বাঁশে ভর দিয়া কালু চারিপানে চায় | চক্ষের নিন্দাটি তার ছাড়্যা নাঞি যায় || তের দলুই চিয়াইল বিস্তর যতনে | সপনের ভারতী বলিল প্রতি জনে || অপরূপ সপন সভাই শুন বাণী | সপনে বলিল পুজা করিতে ভবানী || ঈশ্বরী করিব পূজা ময়না নগর | অবিলম্বে চল যাব শুঁড়িদিগ্যের ঘর || মদ মাংস মিলনে পূজিব সর্বজয়া | লাউসেন রাজ্যে নাঞি কেবা করে দয়া || না জানি কিমর্থে আজি গড়ে লাগে ভারি | কলরব কুচ্ছিত বলিতে নাঞি পারি || তের দলুই সায় দিল কালুর বচনে | দেবীপূজা করিব সন্তোষ বড় মনে || . ****************** . জাগরণ পালার পরের পৃষ্ঠায় . . . . পাতার উপরে . . . মিলনসাগর |
