| রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্য |
| রূপরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের সূচি |
| কানড়া শুনিতে পায় ঘোড়ার হেঁসর | বলিবারে লাগিল ধুমসী বরাবর || ঘোড়ার হেঁসনি কেন শুনিল অপায় | কপালে ঘটিল কিবা বলা নাঞি যায় || রণ জিনি বনি পারা বসিল দুয়ারে | চল চল ধুমসী কলিঙ্গা ভেটিবারে || বাটাভরা পান লহ ঝারিভরা জল | মোর বাণী শুনহ ধুমসী পয়দল || ধাইল ধুমসী দাসী যেন মত্ত গজ | বচন বলিতে পাইল বাহির দলজ || নিধন হইল ঘোড়া জিন দেখি শুন | শিখরে উদয় যেন হইয়াছে উন || শূন্য ঘোড়া দেখিয়া ধূমসী মনে করে | বড় রাণী কলিঙ্গা গেলেন যমঘরে || বারতা বলিতে দাসী উভমুখে ধায় | কান্দিতে কান্দিতে বলে কানড়ার পায় || কলিঙ্গা রাউতি পারা মৈল মাঝরণে | যমঘর গেল ঘোড়া দেখিল নয়নে || শুনিঞা কানড়া হৈল সহজে বিকল | কি বোল বলিবে বনি দুবরিয়া বল || কানড়া কুমারী কত শুনিব বচন | ধৈরজ ধরিতে নারে বিমোহিত মন || করুণা করিয়া কান্দে কানড়া কুমারী | তোমা বিনু জীবন ধরিতে আমি নারি || সকল বচনে মোর সায় দিত দিদি | বচন বলিত মোরে কত সুধানিধি || একদিন সপনে কুন্দল নাঞি হৈল | গুণের সাগর সীতা কোন দোষে মৈল || তোমা দেখি পাসরিল জনকজননী | কোলে করি ক্ষীরখন্ড খাওাতে আপনি || একদন্ড না করিতে নয়ানের আড় | ছোট বনি কানড়া সদাই ছিল চাড় || অই গড়াগড়ি যায় পাশা আর পাটি | পানের সাপুরা আর সিন্দুরের বাটি || কি হৈল কি হৈল বলি কান্দে উভরায় | কি বোল বলিব যবে জিজ্ঞাসিব রায় || আগু হইল তখন ধুমসী পয়দল | কানড়া করিল কোলে মুখে দিল জল || এমন সময়ে এত শোকে মন দিলে | বড় দিদি বনি বলি কান্দিতে বসিলে || জয়দূর্গা পূজিলে সকল ঠাঞি জয় | কেন কর করুণা কিমর্থে মনে ভয় || বলি গেল পাতাল সুরথ স্বর্গবাস | তবে কেন তোর মনে এ সব তরাস || এত শুনি কানড়া বদনে জল দিল | শুভক্ষণে দেবীপূজা আরম্ভ করিল || পাঁচ ভাজা ক্ষীরদন্ড চাঁপাকলা চিনি | কানড়া ঈশ্বরীপূজা করেন আপনি || সরস কুমুদ কিবা কালা ইন্দীবর | আতব কেশুর পানফল মনোহর || পূজা নিতে বিনতি মিনতি অতিশয় | মহাবিদ্যা জপ করে আনন্দ হৃদয় || একমনে জপ করে অভয়াচরণ | আচম্বিতে অম্বিকা দিলেন দরশন || রূপের প্রতাপ যেন নৌতন বিজুলি | স্তব করে কানড়া সমুখে কৃতাঞ্জলি || জগতজননী তুমি যমুনা জৈমুনি | রামায়ণে তোমার মহিমা বড় শুনি || রাবণ বধের হেতু আপনি বিধাতা | অকালে করিল পূজা অসম্ভব কথা || তোমা হেতু সবংশে মজিল দশানন | অবতার বাল্মীকি লিখিল রামায়ণ || এত বলি কান্দে কন্যা কানড়া কুমারী | হিমালয় পর্বতে নির্গত যেন বারি || ভবানী বলেন ঝিএ শুন মন দিয়া | পরিপাটি পূজা এত কিসের লাগিয়া || শুনগো কানড়ার ঝিএ তোরে বলি দড় | কার্তিক গণেশ হৈতে তুমি মোর বড় || অবিলম্বে বল বেটী নিজ প্রয়োজন | কাতর করুণা বাণী কিসের কারণ || এত বলি জিজ্ঞাসিল জগতজননী | কানড়া বলেন পুন করুণা কাহিনী || পশ্চিম উদয় দিতে গেছে প্রাণধন | শ্বশুর শাশুড়ী বন্দী গোউড় ভুবন || মামাশ্বশুর ময়নার রাত্রি দিল হানা | কলিঙ্গা পড়িল রণে না শুনিল মানা || তের দলুই বিলে ডোম হইল নিধন | কালু বীর কাটা গেছে সত্যের কারণ || লঙ্কার সমান ময়না হৈল ছারখার | বারভূঞা সঙ্গে হানা দিল দশবার || পদুমার বিলে পুন করিল মোকাম | অনাদ্যমঙ্গল গায় দ্বিজ রূপরাম || এত শুনি ঈশ্বরী হইল কম্পমান | শশিবর্ণ মুখ হৈল অরুণ সমান || কানড়ার হাতে ধরি বলেন ভবানী | আজি রণে আপনি করিব হানাহানি || আমার সংগ্রামে ভঙ্গ দিল হরিহর | কোন ছার বারভূঞা গৌড়ের পাতর || চল চল সংগ্রামে বিলম্বে কার্য কি | আপনি হেত্যার বান্ধ হরিপালের ঝি || উপলক্ষ্য বিনে আমি রণে যাত্যে নারি | আমার বচন সত্য কানড়া কুমারী || সঙ্গে লব দানাঘটা ডাকিনী যুগিনী | মাঝরণে অবতীর্ণ হইব আপনি || সঙ্গে লহ দোসর ধুমসী পয়দল | রাম রাম শবদে সমুখ রণে চল || আরোহণ কর ঘুড়ি কালিনী পাখরি | কথার বিলম্ব কার্য না হয় সুন্দরী || জোড়হাথে নিল মাথে দেবীর বচন | ইঙ্গিতে ঘুড়ির সাজ করে দশজন || আপনি রাউতি রণে বান্ধিল হেত্যার | আগু দলে ধুমসী বলিছে মার মার || হেত্যার বান্ধিল রাণী বিনোদ পাগড়ি | নিঃসরিতে সমরে সমুখে দেখে ঘুড়ি || জয়দূর্গা মনে করে গুরুর চরণ | কালিনী পাখরি পিঠে কৈল আরোহণ || অইরূপে ঘুড়িকে চাবুক দুই তিন | দাবানল মুখে যেন চঞ্চল হরিণ || সংগ্রামে করিল যাত্রা কানড়া মহিষী | ঘুড়ি আগে আগু দলে ধাইল ধুমসী || সকল ভুবন কাঁপে ধুমসীর দাপে | কেহ বলে এ মাগী মানুষ হৈল শাপে || পার হৈল কালিনী পদুমাপানে চায় | একাকার হাথি ঘোড়া দেখিবারে পায় || ঊড়িয়া লস্করে পড়ে জোড়ে হান কাট | ঘুরুনে বাতাস হৈল ভূপতির ঠাট || ধুমসী ধাইল রণে ধরণীখান নড়ে | দুহাথে হেত্যার ধরি উভ চোট ঝাড়ে || গড়াগড়ি যায় হাথি পর্বতের পারা | যুদ্ধবিশারদ যত বুদ্ধি হৈল হারা || ঝনঝনি শবদে চৌদিগ অস্ত্র পড়ে | বারভূঞা সর্দার সিফাই সব লড়ে || শরে শরে ধানুকী ছাইল বসুমতী | দুহাথে মানুষ কাটে কানড়া রাউতি || এক চোটে পাটহাথি গড়াগড়ি যায় | কানড়ার ঘুড়ি রণে লহরী খেলায় || গোলার শবদ শুনি কাঁপে দিগন্তর | সশঙ্কিত দেবতা অসুর পুরন্দর || টলমল করে মহী ধনুক টঙ্কার | শরে শরে সরণি ধরণী একাকার || মার মার শবদে সংসার কম্পমান | তুরগী টাঙ্গনে যুঝে মগল পাঠান || সাঙ্গ শেল সংগ্রাম সমুখে ঘন ঘোর | সিংহের চৌগুণ জানি ধুমসীর জোর || ধায়্যাচে সমুখ রণে ধরি ঢাল খাঁড়া | উলটি পালটি হানে হাথি আর ঘোড়া || দশবিশ হাত উভে লাফ দিয়া উঠে | ঝাঁপ দিয়া পড়িতে সৈন্যের বল টুটে || . ****************** . জাগরণ পালার পরের পৃষ্ঠায় . . . . পাতার উপরে . . . মিলনসাগর |
